দুর্নীতি অর্থপাচার অবৈধ বিনিয়োগ: টার্গেট দুবাইয়ালা ৪৫৯
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১৩:৪৫
বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্দার মধ্যেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বিদেশি প্রপার্টি ক্রেতাদের মধ্যে বাংলাদেশিরা ছিল শীর্ষে। আমেরিকাভিত্তিক সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজের তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ইইউ ট্যাক্স অবজারভেটরি জানিয়েছে, বাংলাদেশে তথ্য গোপন করে দুবাইয়ে প্রপার্টি কিনেছেন ৪৫৯ বাংলাদেশি। এই অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য চারটি সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ নিয়ে আরেফিন বাঁধনের প্রতিবেদন
কানাডার বেগমপাড়ার পর এবার দুবাইয়ালা: মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম ও কানাডার বেগমপাড়ার পর এবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে প্রপার্টি ক্রয়ের হিড়িক লেগেছে বাংলাদেশিদের। ২০২০-এর জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশিরা দুবাইয়ে ১২ কোটি ৩০ লাখ দিরহাম বা ২৮৮ কোটি টাকার জমি-বাড়ি কিনেছেন। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যারাবিয়ান বিজনেস এমন তথ্য জানিয়েছে। এদিকে, আমেরিকাভিত্তিক সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজের সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ইইউ ট্যাক্স অবজারভেটরি জানিয়েছে, বাংলাদেশে তথ্য গোপন করে দুবাইয়ে প্রপার্টি (সম্পদ) কিনেছেন ৪৫৯ বাংলাদেশি। ২০২০ সাল পর্যন্ত তাদের মালিকানায় সেখানে মোট ৯৭২টি প্রপার্টি কেনার তথ্য পাওয়া গেছে, কাগজে-কলমে যার মূল্য সাড়ে ৩১ কোটি ডলার। আরব আমিরাতের স্থানীয় ভ‚মি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, করোনাকালে দুবাইয়ে বাংলাদেশি ধনীরাই সবচেয়ে বেশি প্রপার্টি কিনেছেন। এমনকি নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, চীন ও জার্মানির মতো দেশগুলোর ধনী নাগরিকদেরও তারা পেছনে ফেলে দিয়েছে। তবে প্রকৃতপক্ষে এসব সম্পত্তি কিনতে ক্রেতাদের ব্যয়ের পরিমাণ আরো অনেক বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইইউ ট্যাক্স অবজারভেটরির পরিসংখ্যানটি করা হয়েছে ২০২০ সালের তথ্য নিয়ে। এরপর গত দুই বছরে দুবাইয়ে বাংলাদেশীদের প্রপার্টি ক্রয়ের প্রবণতা আরো ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে। এ সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি কিনেছে বাংলাদেশীরা, যার তথ্য তারা দেশে পুরোপুরি গোপন করে গেছেন। বিভিন্ন মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দুবাইয়ে বাংলাদেশীদের গোপনে কেনা প্রপার্টির অর্থমূল্য এখন কম করে হলেও ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।

অভিযোগ অনুসন্ধানের নির্দেশ হাইকোর্টের: দেশে তথ্য গোপন করে দুবাইয়ে ৪৫৯ বাংলাদেশির সম্পদ কেনার অভিযোগ অনুসন্ধান করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআরের) প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক আবেদনের শুনানি নিয়ে রবিবার (১৫ জানুয়ারি) রুলসহ এ আদেশ দেন। অনুসন্ধান কার্যক্রমের অগ্রগতি জানিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে চারটি সংস্থাকে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। ‘দুবাইয়ে ৪৫৯ বাংলাদেশির হাজার প্রপার্টি’ শিরোনামে ১০ জানুয়ারি একটি দৈনিকে প্রতিবেদন ছাপা হয়। প্রতিবেদনটি যুক্ত করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুবীর নন্দী দাস ১২ জানুয়ারি আবেদনটি করেন। আদালতে আবেদনের পক্ষে তিনি নিজেই শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন এবং দুদকের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খুরশীদ আলম খান শুনানি করেন। এ ছাড়া আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক শুনানিতে অংশ নেন।

রাজনীতিক-ব্যবসায়ী-আমলারা ভয়ে: অ্যারাবিয়ান বিজনেস জানিয়েছে, দুবাইয়ে যেসব দেশের মানুষ জমি-বাড়ি কিনছেন, তাদের মধ্যে বাংলাদেশিরা সামনের সারিতে। এই অর্থ বৈধ পথে দেশ থেকে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে তা অবৈধ পথেই নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দুবাইভিত্তিক ২০টি বাংলাদেশি আবাসন কোম্পানির ৩০ জন এজেন্টের মাধ্যমে এসব সম্পদ কিনেছেন বাংলাদেশিরা। এই তালিকায় আছেন ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও আমলারা। দুবাইয়ের এসব বিনিয়োগের গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়। এ ছাড়া দেশটিতে ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হলে গোল্ডেন ভিসা দেয়া হয়। ইউএই কর্তৃপক্ষ গোল্ডেন ভিসা সুবিধা চালু করার পর বাংলাদেশিদের দুবাইয়ে প্রপার্টি ক্রয়ের মাত্রা হু হু করে বাড়তে থাকে। বিত্তবান বিদেশিদের আকৃষ্ট করতে ২০১৯ সালে এ ভিসা চালু করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থসম্পত্তির মালিকানা থাকলেই এ ভিসার জন্য আবেদন করা যায়। শর্ত সহজীকরণের পাশাপাশি ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতাগুলোও দূর করা হয়েছে।
ইইউ ট্যাক্স অবজারভেটরির হিসাব অনুযায়ী, দুবাইয়ে মোট প্রপার্টির বাজার ব্যাপ্তি ৫৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের। এর মধ্যে ২৭ শতাংশ আছে বিদেশি মালিকানায়। তথ্য গোপনের কারণে এর মধ্যে ৭ শতাংশ প্রপার্টি মালিকের জাতীয়তা নিশ্চিত করা যায়নি। সার্বিকভাবে প্রপার্টি খাতের বিদেশি মালিকের হার চিহ্নিত ২৭ শতাংশের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দুবাইয়ে বিদেশিদের মালিকানাধীন প্রপার্টির মূল্য অন্তত ১৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। দুবাইয়ের অফশোর প্রপার্টির বাজার ব্যাপ্তির দিক থেকে এখন লন্ডনের অফশোর প্রপার্টির বাজারের দ্বিগুণেরও বেশিতে দাঁড়িয়েছে। যদিও দুবাইয়ের মোট জনসংখ্যা লন্ডনের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি।
ইউডি/এজেএস

