জেকেজি ও রিজেন্ট কাণ্ড: ফেঁসে যাচ্ছেন স্বাস্থ্যের ডিজি?

জেকেজি ও রিজেন্ট কাণ্ড: ফেঁসে যাচ্ছেন স্বাস্থ্যের ডিজি?

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১২ জুলাই ২০২০ । আপডেট ২০:৩০

মোহাম্মদ শিহাব: স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি, দীর্ঘদিনের ওপেন সিক্রেট ইস্যু। এ নিয়ে কিছু মামলা আর ‘ইঁদুর-বিড়াল খেলা’ হয়েছে। তবে দুর্নীতির মূলহোতারা বরাবরই রয়ে গেছেন ধরা ছোয়ার বাইরে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে শুরুর দিকে দুদকের এক কর্মকর্তার মৃত্যুর পর সংস্থাটির অন্য কর্মকর্তারা একরকম হোম কোয়ারেন্টাইনে চলে যান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহাস্রাধিক কর্মকর্তা ও সদস্য আক্রান্ত হন করোনায়। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয় অনেকের। ফলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান থমকে যায়। এই সুযোগে স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতিবাজ চক্র বেশ সরব হয়। বিশেষ করে করোনা সুরক্ষা সামগ্রী কেনাকাটা, টেস্ট কিট, নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট- এসবের নামে চলে হরিলুট। তবে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কঠোর মনোভাব ও গণমাধ্যমের লেখা-লেখির কারণে অসাধুচক্রটির মুখোঁশ উম্মোচন হতে শুরু করেছে। মাস্ক ও পিপিই কেলেঙ্কারীতে এরই মধ্যে পরিবর্তন এসেছে ওষুধ প্রশাসনের ডিজি পদে।

এবার রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি হেলথ কেয়ারে করোনার ভুয়া রিপোর্ট তৈরি ও শত শত কোটি টাকা লুটপাটের ভয়াবহ দুর্নীতি প্রকাশ পাওয়ায় দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের অনেককে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। মামলার পর আত্মগোপনে চলে গেছেন আলোচিত মুখ রিজেন্ট গ্রুপ চেয়ারম্যান সাহেদ। সেই সঙ্গে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের দুষ্টচক্রও এখন বেশ বেকায়দায় আছে।

করোনা টেস্ট জালিয়াতির মূল হোতা কে এই ডা. সাবরিনা?

হৃদরোগ হাসপাতাল থেকে ডা. সাবরীনাকে বরখাস্ত

রিজেন্ট দুর্নীতি: স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ ও বিচার চান ফখরুল

এরই মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে জেকেজি ও রিজেন্ট দুর্নীতিকাণ্ডে। রবিবার (১২ জুলাই) জেকেজি চেয়ারম্যান ডা. সাবরীনা আরিফ চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর আগে শনিবার তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, জেকেজির দুর্নীতি স্বাস্থ্যের মহাপরিচালক (ডিজি) আবুল কালাম আজাদ ‘আগেই জানতেন’।

এদিকে, রিজেন্ট দুর্নীতিকাণ্ডে মন্ত্রণালয়কে অভিযুক্ত করে শনিবার (১১ জুলাই) বিজ্ঞপ্তি দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর পর রবিবার (১২ জুলাই) স্বাস্থ্যের ডিজিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেয়া হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে। অবশ্য অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে পূর্বেও অনেক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। বিশেষ করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্বে থাকাকালীন কেনাকাটায় বড় ধরনের দুর্নীতি হয়। আরও কিছু সরকারি হাসপাতালে কেনাকাটায় বড়ধরনের দুর্নীতি হয়, যার সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ আছে। কিন্তু পূর্বের কোনও অভিযোগেই তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রবিবার (১২ জুলাই) সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শারমিন আকতার জাহান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজিকে শোকজ করা হয়। ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ’ বলতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক কী বোঝাতে চেয়েছেন সে বিষয়ে তার কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

এর আগের দিন শনিবার ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে’ রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে করোনা ডেডিকেটেডের চুক্তি করা হয় বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর। স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমন বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সংস্থাটির মহাপরিচালককে শোকজ করেছে মন্ত্রণালয়।

শোকজ আদেশে বলা হয়, বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির প্রতি মন্ত্রণালয়ে দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে স্বাস্থ্য অধিদফতর রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করেছে। প্রসঙ্গত, যে কোনও হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তির আগে তা সরেজমিনে পরিদর্শন, হাসপাতাল পরিচালনার অনুমতি পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি জনবল ও ল্যাব ফ্যাসিলিটি বিশ্লেষণ করে বিবেচিত হলেই চুক্তি করার সুযোগ রয়েছে। রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তির আগে কি কি বিষয় বিবেচনা করা হয়েছিল চুক্তি করার শর্তগুলো প্রতিপালনে কি কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলতে কি বোঝানো হয়েছে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আগামী তিনদিনের মধ্যে প্রদান করার নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

এর আগে শনিবার (১১ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মার্চ মাসে যখন কোনও হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগী ভর্তি নিচ্ছিল না, তখন রিজেন্ট হাসপাতাল কোভিড ডেডিকেটেড হিসেবে চুক্তি করার আগ্রহ প্রকাশ করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে স্বাস্থ্য অধিদফতর সে সময় রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করে। এই চুক্তির আগে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমকে চিনতেন না, পরিচয় থাকা তো দূরের কথা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সহকারী পরিচালক ডা. মো. জাহাঙ্গীর কবির স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে, রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি গ্রুপের প্রতারণা বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অবস্থান ব্যাখ্যা করা হয়। এতে বলা হয়েছে, রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদ করিমের প্রতারণার খবর বেরিয়েছে, কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদফতর তার বিষয়ে আগে অবহিত ছিল না। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে রোগী ভর্তি নেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এর আগে ক্লিনিক দুটি পরিদর্শন করে চিকিৎসার পরিবেশ উপযুক্ত দেখতে পেলেও তার লাইসেন্স নবায়ন ছিল না। লাইসেন্স নবায়নের শর্ত দিয়ে রিজেন্টের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি হয় গত ২১ মার্চ।

ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই চুক্তির দিনের আগে অধিদফতরের মহাপরিচালকের সঙ্গে সাহেদের ‘পরিচয় তো দূরে থাক, তাকে আগে কখনও দেখেননি তিনি’। তবে সমঝোতার পর বেশ কয়েকবার সাহেদ অধিদফতরে এসেছেন। এ সময় সাহেদ তার সঙ্গে বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির যোগাযোগ আছে, তার হাসপাতালে কোন বিশিষ্ট ব্যক্তির কোভিড আক্রান্ত আত্মীয় ভর্তি আছেন সেসব বলার চেষ্টা করতেন। এতে আরও বলা হয়, গোয়েন্দা ও অন্যান্য সূত্রে রিজেন্ট হাসপাতাল নিয়ে তাদের কাছে অভিযোগ আসছিল। এর ভিত্তিতে গত ৬ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে র‌্যাব অভিযান চালায়।

রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে অধিদফতরের সমঝোতা স্মারকের বিষয়ে অধিদফতরের অবস্থান ‘পরিষ্কার’ এবং একটি ‘ভালো কাজ করতে গিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রতারিত হয়েছে’ বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। এ কারণে ৭ জুলাই হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে।

একই বিজ্ঞপ্তিতে স্বাস্থ্য অধিদফতর জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ার (জেকেজি) নামের আরেক প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার বিষয়েও তাদের অবস্থান সম্পর্কে জানানো হয়। বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সমন্বয়ক আরিফুল চৌধুরী ওভাল গ্রুপ লিমিটেড নামে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট গ্রুপের স্বত্বাধিকারী। ওভাল গ্রুপ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে স্বাস্থ্যসেবা সপ্তাহ ২০১৮-এর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব পালন করে।

‘মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের’ নির্দেশে রিজেন্ট ও জেকেজি’র সঙ্গে চুক্তি : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

কোভিড সংকট শুরু হওয়ার পর আরিফুল চৌধুরী অধিদফতরে এসে জানান, জেকেজি দক্ষিণ কোরিয়ার মডেলে বাংলাদেশে কিছু বুথ স্থাপন করতে চায়। ওভাল গ্রুপের সঙ্গে আগে থেকেই কাজের অভিজ্ঞতা থাকার কারণে তাদের অনুমতি দেওয়া যায় বলে মনে করে স্বাস্থ্য অধিদফতর বা মন্ত্রণালয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রতারণার অভিযাগ পাওয়া গেলে স্বাস্থ্য অধিদফতর জেকেজি গ্রুপের সঙ্গে তাদের চুক্তি বাতিল করে।

বিজ্ঞপ্তিতে স্বাস্থ্য অধিদফতর বলে, ‘ইদানিং কোনও স্বার্থান্বেষী মহল কল্পিত ও মিথ্যা তথ্য নিয়ে গণমাধ্যমকে বিভ্রান্ত করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সুনাম নষ্ট করার প্রয়াস চালাচ্ছে’।

আরও বলা হয়, ‘কোনও কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি অসততা বা অন্যায়ের আশ্রয় নেন, সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের অবস্থান স্পষ্ট। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনানুযায়ী যথাযথ শাস্তি হোক তা সবাই প্রত্যাশা করে। কিন্তু, অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠান ও পদ্ধতিগত সাধারণ সীমাবদ্ধতাগুলোকে আমলে নেওয়া হচ্ছে না। সহানুভূতির বদলে তীর্যক মন্তব্য এবং খণ্ডিত ও বিকৃতভাবে তথ্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। অশালীনভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে ব্যক্তিগত চরিত্র হননের প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। এসবের পেছনে হীন ব্যক্তিস্বার্থ কাজ করে বলে আমরা মনে করি। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, নিষ্ঠাবান কর্মকর্তারা এখন মিডিয়ায় বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার বিষয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন না। ফলে আরও বেশি করে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ছে। কেউ অপরাধ করলে তদন্তেই তা ধরা পড়বে এবং শাস্তিও হবে।’

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর সংশ্লিষ্টরা এখন একে অন্যের ওপর দায় চাপাতে চাচ্ছেন। তবে সরকারের উচ্চ মহলের নির্দেশনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতার মাধ্যমে স্বাস্থ্য বিভাগে ঘাপটি মেরে থাকা প্রকৃত দুষ্টচক্রর মুখোঁশ এবার উম্মোচন হবে- সেটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জেকেজি চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা গ্রেপ্তার

জেকেজি’র প্রতারণার ব্যাপারে ‘আগেই জানতেন ডিজি হেল্থ’!

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading